ক্যাম্পাস

১৫৪ বছরে পদার্পণ করলো রাজশাহী কলেজ

55views

সময়ের প্রবাহে বদলে যায় প্রজন্ম, পাল্টে যায় বাস্তবতা। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান সময়কে অতিক্রম করে প্রতিনিয়ত নতুন করে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে। তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রাজশাহী কলেজ।

বুধবার (১ এপ্রিল) ১৫৪ বছরে পা রাখল দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৮৭৩ সালের এই দিনে মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল রাজশাহী কলেজের। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সেই ছোট পরিসরের শিক্ষালয় আজ প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এক প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছে। পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো যেন প্রতিদিনই শোনায় ইতিহাসের গল্প।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উত্তরাঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে রাজশাহী কলেজ। দুবলহাটির রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী ও দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে উত্তরবঙ্গে প্রথম বিএ কোর্স চালু করে। ফলে শিক্ষার আলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ অঞ্চলে।

ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের পর দেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ হিসেবে রাজশাহী কলেজ সময় ও ঐতিহ্যের বিচারে এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে।

শুধু শিক্ষা নয়, দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামেও ছিল এ প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯৫২ সালে শহীদদের স্মরণে দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল এই ক্যাম্পাসে, যা পরদিনই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেঙে দেয়। যা বর্তমানে প্রাচীন কলেজ মুসলিম হোস্টেলে অবস্থিত।

কলেজের প্রতিটি স্থাপনা বহন করে ইতিহাসের সাক্ষ্য। ১৮৮৪ সালে নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, হাজি মুহাম্মদ মহসীন ভবন ও ফুলার ভবনে এখনও রয়েছে স্পষ্ট ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ। সবুজে ঘেরা নান্দনিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ।

এই বিদ্যাপীঠ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন ও শিক্ষকতা করেছেন অসংখ্য গুণীজন। জ্যোতি বসু, ঋত্বিক ঘটক, এ কে খন্দকার ও হাবিবুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বদের পদচারণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই ক্যাম্পাস।

বর্তমান সময়েও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে রাজশাহী কলেজ। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়াই-ফাই সুবিধা, সিসি ক্যামেরা নিরাপত্তা, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তুলেছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। পাশাপাশি বিতর্ক, নাটক, সংগীতসহ অর্ধশতাধিক সহশিক্ষা সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে কলেজ প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন অধ্যক্ষ ইব্রাহিম আলী। তিনি বলেন, রাজশাহী কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস শুধু কলেজের জন্য নয়, বরং সমগ্র রাজশাহীবাসীর জন্যই এক গৌরবের দিন। ১৮৭৩ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলা তথা উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল। সে সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার জন্য আসতেন, যা এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা সেই গৌরবময় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক, যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যয় হবে -১৫৪তম প্রতিষ্ঠা দিবসকে সামনে রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে রাজশাহী কলেজকে আরও এগিয়ে নেওয়াই হবে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

দেড় শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে রাজশাহী কলেজ আজও জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে এগিয়ে চলা এই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতেও দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে -এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

Leave a Response

সুশ্রী সরকার

সুশ্রী সরকার

কন্ট্রিবিউটর
দৈনিক ইত্তেফাক-এ লেখালেখির মধ্য দিয়ে আমার লেখকসত্তার যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর। বর্তমানে আমি ইনসাইড বাংলা-তে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত লিখছি। আমার জন্ম ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে। বেড়ে উঠেছি কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতিবাহী বনলতা সেনের শহর নাটোরে। বর্তমানে আমি রাজশাহী কলেজের সমাজকর্ম বিভাগে অধ্যয়নরত। সমাজ, মানুষ ও সময়ের নানামাত্রিক গল্প তুলে ধরাই আমার লেখালেখির প্রধান আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা!