ক্যাম্পাসমতামত

নতুন উপাচার্য , নতুন প্রত্যাশা: কেমন নোবিপ্রবি চায় শিক্ষার্থীরা?

270views

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি:

দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে একযোগে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নবনিযুক্ত উপাচার্য কাছে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আশা, উপাচার্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়ে তুলবেন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনো ধরনের দুর্নীতির সুযোগ না থাকে।

নতুন উপাচার্যকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ভাবনা, প্রত্যাশা ও বিভিন্ন মতামত জানতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন ইনসাইডার বাংলার নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মেহেদী হাসান।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্য থেকে প্রত্যশ্যা জানিয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: ইশতিয়াক জামিল বলেন,”নতুন ভিসি মহোদয়ের কাছে আমার প্রত্যাশা একাডেমিক ভবন – ৩ এর কাজ অতি দ্রুত শুরু করবেন। বিগত সময়ে নোবিপ্রবির অবকাঠামোগত উন্নয়ন অগোছালো ভাবে হয়েছে। তাই, ওনার সময়ে যেসব অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি করবেন তা যেন হয় পরিকল্পনা মাফিক এবং বাস্তব সম্মত। তিনি আরো বলেন,এছাড়া যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণার জায়গা, বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যাতে শিক্ষার্থীরা গবেষণার প্রতি উদ্ভুদ্ধ হয়। তিনি তার কাজের মাধ্যমে যাতে সেই অনুপ্রেরণা দায়ক পরিবেশ বজায় রাখেন। সর্বোপরি, শিক্ষার্থীদের সকল সুবিধা অসুবিধা তিনি বিবেচনায় রাখবেন, একটা নিরাপদ ক্যাম্পাস তৈরি করবেন এবং তিনি তার প্রাপ্ত দায়িত্বকে মহান দায়িত্ব হিসেবে ধারণা করে বিশ্ব র‍্যাংকিং এ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে সাবেক ভিসি থেকে আরও এগিয়ে নিবেন।”

শিক্ষার্থীদের স্কিল, ক্যারিয়ার ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বৃদ্ধি বিষয় জানিয়ে অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন পারভেজ বলেন,”আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বলতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রণয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রম জোরদার করা এবং industry–academia সংযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি internship ও placement সুযোগ সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।ডিজিটাল ক্যাম্পাস গঠন, স্মার্ট ক্লাসরুম, অনলাইন প্রশাসন ও দ্রুতগতির ওয়াইফাই নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, স্কলারশিপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও সম্প্রসারণ করা দরকার। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করে নোবিপ্রবিকে গবেষণামুখী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।”

নোবিপ্রবিতে আধুনিক ও কার্যকর ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানিয়ে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো.আবু তাহের বলেন,”একজন শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক উন্নয়ন ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা। বর্তমানে মাঠে নিয়মিত পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্ত মাঠকর্মীর অভাব রয়েছে, ফলে খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ সবসময় নিশ্চিত করা যায় না। এছাড়া মাঠে সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকাও দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। আন্তবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতা ও মানসিক অনুপ্রেরণা ব্যাহত হচ্ছে, একইসঙ্গে আন্তডিপার্টমেন্ট টুর্নামেন্টগুলোর মানোন্নয়নও প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন,পাশাপাশি শরীরচর্চা বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। আমরা আশা করি, নতুন প্রশাসন এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এবং একটি শিক্ষার্থী-বান্ধব, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলবে।আমরা বিশ্বাস করি, নতুন প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগে NSTU-এর ক্রীড়াঙ্গন নতুন গতি ও প্রাণ ফিরে পাবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ ও বিকশিত হবে।”

নোবিপ্রবিকে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে চাওয়া জানিয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান সিফাত বলেন, “নবনিযুক্ত উপাচার্য মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী স্যারের নেতৃত্বে নোবিপ্রবি শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং গবেষণামুখী একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলা।

পাশাপাশি আধুনিক ল্যাব, গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী–প্রশাসনের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক সম্পর্ক তৈরির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আমরা আশা করি, তাঁর নেতৃত্বে নোবিপ্রবি একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে।”

ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ হাসান বলেন,”নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি আশা করি, আমাদের নতুন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজট ও দুর্নীতিমুক্ত একটি আদর্শ শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। একই সঙ্গে তিনি গবেষণা কার্যক্রম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়নে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা করি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস। সর্বোপরি, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ছাত্রবান্ধব পরিবেশ প্রত্যাশা করি, যেখানে শিক্ষার্থীদের মতামত ও কল্যাণ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

আন্তরিক উদ্যোগেই বদলে যেতে পারে নোবিপ্রবির ভবিষ্যৎ এই আশাবাদ ব্যক্ত করে ইংরেজি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাব্বি হোসেন বলেন, “১০১ একরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভাবনার কোনো অভাব নেই, প্রয়োজন শুধু আন্তরিক সদিচ্ছার। সদ্য সাবেক উপাচার্য যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছেন, সেগুলো যদি নতুন উপাচার্য বাস্তবায়ন করতে পারেন, তাহলে তিনি হয়ে উঠবেন সকলের আস্থার ভিসি স্যার এবং নোবিপ্রবির ইতিহাসে একজন সফল ও সেরা উপাচার্য।”

নতুন উপাচার্যকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে—গবেষণাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেশনজট নিরসন, আবাসন সংকট সমাধান, ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন এবং সর্বোপরি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা।

শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম শীর্ষ গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে। নতুন উপাচার্যের নেতৃত্বে সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

Leave a Response