
এক দিন আগেও যে বাড়ি ছিল হাসি খেলায় উৎসবমুখর, আজ সেই বাড়ি নীরব আর নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা আসছেন, দেখছেন শিশু মিজবাহর প্রাণ যাওয়া সেই নিষ্ঠুর নলকূপের গর্ত। অপলক দৃষ্টিতে বাবা সাইফুল ইসলামও তাকিয়ে আছেন তার ছেলের জীবন কেড়ে নেওয়া সেই গর্তের দিকে। কিছুক্ষণ পর সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি কথা বলতে শুরু করেন। বলতে থাকেন প্রিয় ছেলের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলোর কথা। ছেলের এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে না পেরে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। জ্ঞান ফিরলেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
ছেলেকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বাবা সাইফুল বলেন, আমি একজন দিনমজুর। যখন যে কাজ পাই তাই করে আমাদের সংসার চলে। আমাদের অভাবের সংসারে একটি কন্যাসন্তানের পর আসে মিজবাহ। আলোকিত করে আমাদের সংসার। অভাব-অনটনে দিন পার করলেও সুখে ভরা ছিল আমার প্রিয় সন্তান মিজবাহ। কিন্তু আজ আমার সব সুখ শেষ হয়ে গেছে। বিকালে আসরের আজানের সময় ঘর থেকে বের হই। তখন আমার মেয়ে মীমসহ তার ভাই খেলছিল। হঠাৎ খবর আসে আমার ছেলে গর্তে পড়ে গেছে। আমি ভেবেছি সে পাহাড়ের টিলা থেকে পড়ে গেছে। গিয়ে দেখি পানির জন্য বসানো নলকূপের পাশে পূর্ববর্তী একটি কূপের গর্তে পড়ে গেছে আমার ছেলে মিজবাহ। তখনও সে জীবিত ছিল।
আমাকে বলেছে, বাবা আমাকে তোল। আমি হাতের কাছে যা ছিল প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তা দিয়ে চেষ্টা করি। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তারাসহ সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা করে আমার ছেলেকে উদ্ধার করে। তবে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সে মারা গেছে বলে জানতে পারি। আমি চাই, এমন আর কারও বুকের ধন না হারাক।
নিহত মিজবাহর বোন মীম বলেন, আমি ভাইকে নিয়ে খেলছিলাম। সে হঠাৎ গর্তে পড়ে যায়। আমি ধরতে আসি। কিছুক্ষণ সে আমার আঙুল ধরেছিল। তারপর নিচে পড়ে কান্না করতে থাকে। আমি আমার আম্মু এবং আব্বুকে ডাক দিই।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কালু বলেন, নলকূপ খননের সময় প্রথমে যে গর্তটি করা হয় সেখানে পানি পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পাশে আরেকটি গর্ত করা হয়। তবে আগের গর্তটি তারা ভরাট করেনি। যার কারণে এমন বিপদ নেমে এলো। ঘটনার পর ভেকু দিয়ে পাশে গর্ত করে মিজবাহকে উদ্ধার করা হয়। তবে পাশের গর্তটিও ভরাট করা হয়নি। এটি জরুরি ভিত্তিতে ভরাট করতে হবে। তা না হলে এলাকায় আরও যেসব ছোট বাচ্চা রয়েছে তাদের বিপদ হতে পারে।
উল্লেখ্য, বুধবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে তিন বছর বয়সি মিজবাহর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। প্রায় ৪ ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান শেষে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বুধবার বিকাল ৪টার দিকে বাড়ির পাশে থাকা একটি পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যায় সে।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান জানান, বুধবার রাত ৮টার দিকে শিশুটিকে উদ্ধার করে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
রাউজান থানার ওসি মো. সাজেদুল ইসলাম জানান, উদ্ধার শেষে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত শিশুটির বাড়ি থেকে প্রায় ৩০-৪০ ফুট দূরে চার-পাঁচ বছর আগে সরকারিভাবে গভীর নলকূপের জন্য গর্ত খোঁড়া হলেও সেখানে নলকূপ স্থাপন করা হয়নি। বুধবার বিকালে ওই গর্তে পড়ে শিশুটি নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
মিজবাহর পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তিন বছরের পুরোনো সরকারি প্রকল্পের টিউবওয়েল পাইপের জন্য গর্তটি তৈরি করা হয়েছিল।
শিশুটির মা রাশেদা বেগম বলেন, ঘরের পাশে ঢালুস্থানে সরকারি প্রকল্পের টিউবওয়েলের জন্য তিন বছর আগে গর্তটি তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে আমরা খড়কুটো ফেলে ভরাট করার চেষ্টা করেছি। বুধবার বিকালে আমি ঘরে ছিলাম। ছেলেটি পাশে খেলছিল। কখন পড়ে গেছে জানি না। পরে কান্না শুনে গিয়ে দেখি আমার ছেলেটি গর্তের ভেতরে। আম্মু, আম্মু বলে চিৎকার করছিল।
রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, প্রকল্পে গর্তটি করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। শিশুটিকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।






