ক্যাম্পাস

অবহেলায় নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার

156views

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি :

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসের বুকে অনন্য এক দিন। পৃথিবীর একমাত্র জাতি হিসেবে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছিল বাঙালি। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন জাতীয় চেতনা ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। সেই আত্মত্যাগের স্মারকই শহিদ মিনার।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের চিত্র সেই মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বছরের অধিকাংশ সময় শহিদ মিনারটি পড়ে থাকে অবহেলা ও অযত্নে। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, দেয়ালে শেওলার আস্তরণ, চারপাশে আগাছা আর ধুলাবালিতে ঢেকে থাকা বেদি এ যেন নীরব এক বিস্মৃত স্মৃতি। অনেক সময় বেদিতে জুতো পায়ে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায় অসচেতন শিক্ষার্থী কিংবা বহিরাগতদের। আশেপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার ঘটনাও নতুন নয়।

তবে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে শুরু হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রঙের কাজ। শ্রমিকরা পুরোনো শেওলা ঘষে তুলে ফেলেন, নতুন রঙে সাজানো হয় মিনার পুরো আয়োজন যেন হঠাৎ করেই শহিদ মিনারের প্রতি যত্নের বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই যত্ন কেবল ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন ফেরদৌস রোমা বলেন, “১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ ও সাহসের প্রতীক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ মিনারটির দিকে তাকালে মনে হয় এটি যেন প্রশাসনের চরম উদাসীনতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই বিদ্রোহী খ্যাত নজরুলের এই আঙিনায় শহীদদের আত্মত্যাগ অম্লান থাকুক। সেই সঙ্গে অবহেলায় পড়ে থাকা শহীদ মিনারটি সংস্কারের দাবি জানাই।”

নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জামান লেলিন বলেন, “শহিদ মিনার একটি রাষ্ট্রীয় প্রতীক। অথচ এটিকে বছরের পর বছর অবহেলায় ফেলে রাখা হয়। ভাষার মাস এলে কয়েকদিনের জন্য সাজসজ্জা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই অবস্থা আগের মতো হয়ে যায়। এরপর সারা বছর জায়গাটি পড়ে থাকে অযত্নে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, শহিদ মিনারের মতো মর্যাদাপূর্ণ স্থাপনার পাশেই ময়লার ভাগাড় রাখা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা।”

চারুকলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরোজ হৃদীও একই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “২১ ফেব্রুয়ারি ছাড়া বছরের বাকি সময়গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার অবহেলায় পড়ে থাকে। অথচ শহিদ মিনারের নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এখানে কোনো লাইটিং ব্যবস্থা নেই, ফলে সবসময় অন্ধকারে ঢাকা থাকে। জলাবদ্ধতা ও আবর্জনার কারণে প্রচুর মশার জন্ম হচ্ছে, যা একটি বিরূপ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করছে। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারকে যথাযথ মর্যাদা ও যত্ন দেওয়া হোক।”

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির বাইরে গিয়ে সারা বছরই শহিদ মিনারের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার নিশ্চিত করা হোক। ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির শিক্ষাঙ্গনে শহিদ মিনারের মর্যাদা যেন কেবল একটি দিনের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

Leave a Response