ক্যাম্পাস

ঈদের ছুটিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস, স্মৃতিতে রঙিন শৈশব

172views

শিক্ষার্থীরা পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশজুড়ে কেটেছে আনন্দঘন সময়। ব্যস্ত পড়াশোনার ফাঁকে দীর্ঘ এই ছুটি কেমন কাটলো, ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি কতটা নাড়া দেয় এখনও, আর ছুটি ঘিরে কাদের কী পরিকল্পনা ছিল এসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন ইকবাল মাহমুদ।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী আফিয়া আলম বলেন, “ছোটবেলায় ঈদ ছিলো সুখকর আত্নিক প্রশান্তি। ছোটকালে ঈদ কাটতো পরিবারের সকলের সাথে।ঈদে নতুন জামা পড়া, মেহেদী পড়া, ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া সব মিলিয়ে ছিলো প্রবল খুশির আমেজ।বরাবারই পড়াশোনায় ভালোই ছিলাম।সারাবছর লেখাপড়া নিয়ে থাকতাম। বছর শেষে ছুটি থাকতোও একদমই অল্প। ঈদের সময় পেতাম দীর্ঘায়িত ছুটি। এই সময় খেলাধুলা, গল্প, আড্ডা, নিরলস ঘুম,ইচ্ছামতো খাওয়া দাওয়া করতে করতে কখন যে সময় চলে যেতো বুঝতেই পারতাম না। পড়াশোনার কথা বলতে গেলে ভুলেই যেতাম।ঈদের সময়ে একটি বিশেষ মজা ছিলো দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যেখানে আগে কখনো যায়নি।নতুন জায়গার আনন্দ স্মৃতির পাতায় নতুন অভিজ্ঞতা সংযোজন করতো।এখনো ঈদ আসে ঈদ যায় কিন্তু ঈদের ছুটিতে সেই আনন্দঘন, সহজ-সরল সময়গুলো আর ফিরে আসেনা।সময়ের সাথে সবকিছু কিছুটা বদলে গেছে কিন্ত বদলায়নি ঈদের বাঁধভাঙা আনন্দ যা আমাদের স্মৃতিতে আজও অম্লান।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা সারিন সুমি বলেন, “ঈদ বরাবরের মতোই আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর প্রশান্তির এক অপূর্ব মিশেল। আমার কাছে ঈদ -উল- ফিতরের মূল আনন্দ মূলত দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যে নিহিত। তবে বাসা থেকে দূরে থাকায় ঈদের ছুটিতে ঘরে ফেরার অনুভূতি, ঈদের আনন্দেতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর এটাই আমার বড় ছুটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশে, ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনার একঘেয়ে জীবনের সাময়িক ক্লান্তির অবসান এনে দিয়েছে ঈদের ছুটি । ঈদ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করা—সব মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ ঈদ কেটেছে বেশ উচ্ছ্বাসময়। তবে ছোট বেলার ঈদকে ভীষণ ভাবে মিস করি। ছোটবেলায় আমি প্রতিদিন লুকিয়ে লুকিয়ে ঈদের জামা বের করে দেখতাম,কবে ঈদ আসবে! নতুন জামা পড়বো , এছাড়াও আতশবাজি, আম্মুর দিয়ে দেওয়া ঘিজিমিজি মেহেদী , ঈদ সালামি এখন অসাধারণ অনুভূতির স্মৃতি মাত্র। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ ছিল স্মৃতিময়, প্রশান্তিময় , আনন্দময়এবং কিছুটা হলেও নিজের ও পরিবারের সাথে সুন্দর সময় কাটানোর উপলক্ষ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া সুলতানা তিশা বলেন, “ঈদের ছুটি কেমন কাটলো: এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এমন বলতে হয় যে, ব্যস্ততার মাঝে এমন লম্বা ছুটি সত্যিই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছিলো। এই ছুটির সময়ে সব প্রতিষ্ঠানই ছুটি দেয় ,যার ফলে বিভিন্ন কর্মরত থাকা আত্মীয়স্বজন , দূরদূরান্তে পড়াশুনা করা বন্ধুরা এবং নিজেও পরিবারের সাথে দেখা করা ও সবার সাথে সময় কাটানোর সুযোগ হয়ে ওঠে এই সুযোগে । ঈদ মানেই তো আনন্দ আর এই আনন্দ আরো বহুগুণ হয়ে যায় , যখন সেই চিরচেনা মানুষগুলো এক হয়ে এই আনন্দ উপভোগ করতে পারি। ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি: ঈদের নির্ভেজাল আনন্দ যেনো সেই ছোটবেলাতেই রয়ে গেছে। ছিলোনা কোনো কর্মব্যস্ততা, ছিলোনা পরিবার থেকে দূরে থাকার চিন্তা, নতুন জামা কেনার আমেজ, অল্প সালামিতেই তখন ঈদ ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ ! আর চারিদিকে বাজানো হয়তো কাজী নজরুল ইসলাম রচিত সেই কালজয়ী গান , “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” যা ছাড়া ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পেতো না। এই সব কিছুই কেমন যেনো এক স্মৃতিতে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আর ব্যস্ত হল জীবনের মাঝে এমন লম্বা ছুটি সত্যিই স্বস্তির বিষয় ছিল। এই ছুটিতে সকলে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, কেউ গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মে জড়িত হয়েছে, কেউ পরিবারকে সময় দিয়েছে, কেউ নিজের অপূর্ণ কাজগুলোকে গুছিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছে, কেউবা পূর্ণ ছুটিতে পড়াশোনাতে ব্যস্ত থেকেছে ।সবমিলিয়ে এই ঈদের ছুটি শুধু আনন্দ দেই নাই, সাথে দিয়েছে নতুন করে করা পরিকল্পনা পূর্ণ করার আভাস।নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে চলার শক্তি আর অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছে।”

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজাতুন নেশা শান্তি বলেন,” ঈদের এই দীর্ঘ ছুটিটা যেন ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে এক টুকরো নরম বিরতি। প্রতিদিনের সেই ক্লাস, পড়াশোনা, দায়িত্ব, এসবের ভিড়ে এমন কয়েকটা দিন, মনকে একটু ধীর করে দেয়। হয়তো সময়ের সাথে ঈদের ধরন বদলে যায়, কিন্তু এর ভেতরের অনুভূতিগুলো একই থাকে— ভালোবাসা, পরিবারের সবার সাথে ঈদ উদযাপন, নতুন জামার উচ্ছ্বাস, সারাদিন বন্ধুদের সাথে হাসি আর দৌড়ঝাপ, আর কিছু নরম স্মৃতি। সেই স্মৃতিগুলোই হয়তো বছরজুড়ে মনকে আলো দিয়ে রাখে। এখন ঈদের আনন্দের সাথে যোগ হয়েছে এক ধরনের নীরব প্রশান্তি—পরিবারের পাশে থাকার স্বস্তি, প্রিয়জনদের হাসিমুখ দেখার আনন্দ এবং কিছু সময় নিজের সাথে কাটানোর সুযোগ। বরাবরের মতো ব্যাগ ভর্তি করে বই নিয়ে এসেছিলাম। এই ছুটিতে আমার পরিকল্পনা ছিল পরিবারের সাথে সময় কাটানো, মনটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়া, পাশাপাশি পড়াশোনাটাকে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা, যেন ছুটির প্রশান্তি নিয়ে আবার নতুন উত্তমের ব্যস্ত ক্যাম্পাস জীবনে ফিরে যেতে পারি। ঈদের এ প্রশান্ত দিনগুলোই হয়তো আবার নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয়ে থাকবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনুভা বিনতে ইসলাম বলেন, “ঈদের ছুটি আমাদের জীবনে এক ধরনের স্বস্তি ও আনন্দের মুহূর্ত নিয়ে আসে। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এই সময়টা যেন একটু থেমে নিজের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়। আমার ঈদের ছুটি বেশ ভালোই কেটেছে। পড়ালেখার উদ্দেশ্যে পরিবার থেকে যেহেতু অনেক দূরে থাকা হয়, ঈদের ছুটির সময় টা পরিবারের সঙ্গে কাটানো, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, যারা আমাদের মাঝে নাই তাদেরকে স্মরণ করা—সব মিলিয়ে দিনগুলো আনন্দময় ও প্রশান্তির। ঈদ মানেই আমার ছোটবেলার অসংখ্য মধুর স্মৃতি। নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ, সকালে তাড়াতাড়ি উঠে আব্বুকে নামাজে যেতে সাহায্য করা, আম্মুকে রান্নাবান্নায় সাহায্য করা,সকাল সকাল নতুন জামা পড়া, ঈদি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা—এসব স্মৃতি আজও মনে পড়লে মনটা ভরে যায়। তখন ঈদের আনন্দ ছিল একেবারেই নির্ভেজাল, ছোট ছোট বিষয়েই কত খুশি হয়ে যেতাম! বর্তমানে পড়াশোনার ব্যস্ততার কারণে এমন লম্বা ছুটি খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই এই ছুটিকে ঘিরে সবারই কিছু না কিছু পরিকল্পনা ছিল। কেউ পরিবারকে সময় দিতে চেয়েছে, কেউ আবার নিজের অসমাপ্ত কাজগুলো গুছিয়ে নিতে চেয়েছে। আমারও ইচ্ছা ছিল কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনার কিছু কাজ এগিয়ে রাখা। তবে সত্যি বলতে, পরিকল্পনার চেয়ে অনুভূতির দিকটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানোই হয়ে উঠেছে এই ছুটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।সব মিলিয়ে, ঈদের ছুটি শুধু আনন্দের নয়, বরং এটি আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরও দৃঢ় করে এবং নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।”

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র এবং গণমাধ্যম বিভাগের শিক্ষার্থী জিহানুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, “মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় ও আনন্দের দুটি উৎসব হলো ইদ। ইদের দিন সবসময়ই আমার ভেতরে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। ফজরের নামাজের পর থেকেই যেন ইদের আমেজ শুরু হয়ে যায়। সকালে উঠে সেমাই-ফিরনি খাওয়া, নতুন ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করে নামাজে যাওয়া, আর নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কোলাকুলি ও আড্ডা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দে ভরপুর। ইদের আনন্দের কথা বলতে গেলেই আমি প্রায়ই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। ছোটবেলার ইদ ছিল আরও বেশি রঙিন ও প্রাণবন্ত। ইদ কার্ড বিতরণ, সালামি সংগ্রহ, আর চাঁদরাতে ভাই-বোনদের সাথে একসাথে গল্প ও আড্ডার স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও ইদের সেই আনন্দ, ভালোবাসা আর একসাথে থাকার অনুভূতি কখনোই বদলায় না। ইদ আমাদের শেখায় একে অপরের পাশে দাঁড়াতে, ভালোবাসা ভাগ করে নিতে এবং সম্পর্কগুলোকে আরও সুন্দর করতে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন রুদ্র বলেন, “ঈদের ছুটি যেন ব্যস্ত জীবনের ভেতরে হঠাৎ থেমে যাওয়ার এক নরম বিরতি যেখানে সময়টা কেবল নিজের আর আপনজনদের জন্য। এবারের ঈদও ঠিক তেমনই- শব্দহীন শান্তি, পরিচিত মুখের হাসি আর ছোট ছোট মুহূর্তে জমে ওঠা অদ্ভুত এক ভালো লাগা। ছোটবেলার ঈদ ছিল একেবারেই অন্যরকম- সেই অস্থির অপেক্ষা, নতুন জামা লুকিয়ে রাখার মজা, সকালে ঘুম ভাঙার আগেই ঈদের উত্তেজনা… আর দিনশেষে ক্লান্ত শরীরেও ভরপুর তৃপ্তি। এখন সময় বদলেছে, কিন্তু স্মৃতিগুলো ঠিকই আগের মতো রঙিন রয়ে গেছে। পড়াশোনার চাপের ভিড়ে এমন দীর্ঘ ছুটি যেন নিজের সঙ্গে একটু বোঝাপড়ার সুযোগ এনে দেয়। কেউ ফিরে গেছে শিকড়ে, কেউ খুঁজেছে নিজের ভেতরের শান্তি। আমারও পরিকল্পনা ছিল একটু থামা, ভাবা আর নতুন করে শুরু করার সাহস জোগাড় করা। সব মিলিয়ে, ঈদটা কেবল উৎসব নয়, এটা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারেরও এক নীরব উপলক্ষ।”

Leave a Response