ক্যাম্পাস

অনার্সে ৩.৩৫ সিজিপিএ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি পেলেন মাভাবিপ্রবির রাফি মাহমুদ

39views

মো:জিসান রহমান, মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি:

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী রাফি মাহমুদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় R1 শ্রেণিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়েছেন। বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তির পাশাপাশি টিউশন ফি, স্বাস্থ্য বীমা এবং জীবনযাপনের ব্যয় বাবদ বার্ষিক ৩৪ হাজার ডলারের গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ অর্জন করেছেন। আগামী আগস্ট ২০২৬ থেকে তার পিএইচডি যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ক্যারিয়ারের এই উল্লেখযোগ্য অর্জনের পেছনে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল মোটেও সুখকর নয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অসুস্থতার প্রভাব পড়েছিল তার একাডেমিক ফলাফলেও—প্রথম কয়েক সেমিস্টারে তার সিজিপিএ নেমে আসে ২.১৯-এ। তবে ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ়তার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। শেষ পর্যন্ত অনার্স সম্পন্ন করেন ৩.৩৫ সিজিপিএ নিয়ে এবং মাস্টার্সে অর্জন করেন ৩.৬৭ সিজিপিএ।

রাফির গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান icddr,b-তে কাজ করার মাধ্যমে। সেখানে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে তিনি গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার রয়েছে ৭টি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রকাশনা, ২টি পোস্টার প্রেজেন্টেশন এবং ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ওরাল প্রেজেন্টেশনের অভিজ্ঞতা। এছাড়া একাধিক গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছেন, যার মধ্যে কিছু গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

তার গবেষণার মূল বিষয় যক্ষ্মা (টিউবারকিউলোসিস) এবং এর আণবিক জটিলতা। রাফির ভাষ্য অনুযায়ী, যক্ষ্মার জীবাণু মানুষের শরীরে দীর্ঘ সময় সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে এবং কখন এটি সক্রিয় হবে, তা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি এখনো নেই। এই সুপ্ত ও সক্রিয় অবস্থার পার্থক্য নির্ণয়ই তার গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি তিনি ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার আণবিক প্রক্রিয়া নিয়েও কাজ করছেন।

আইইএলটিএস পরীক্ষায় ৭ স্কোর অর্জনের পর তিনি মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান Cold Spring Harbor Laboratory থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও, একটি R1 বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল-ফান্ডেড অফার পান তিনি।

কম সিজিপিএ নিয়েও কিভাবে এ সফলতা জানতে চাইলে রাফি বলেন,”আন্তর্জাতিক পিএইচডি ভর্তিতে সিজিপিএ একটিমাত্র উপাদান, সম্পূর্ণ মানদণ্ড নয়। আমার সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে গবেষণা অভিজ্ঞতা, গবেষণা প্রকাশনা, শক্তিশালী পার্সোনাল স্টেটমেন্ট, শক্তিশালী রেকমেন্ডেশন লেটার এবং ভালো IELTS স্কোরের সমন্বয়।”তবে নবীনদের শুরু থেকেই সিজিপিএটা ভালো রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

নিজের ক্যারিয়ারকে কয়লা থেকে হীরা হওয়া উল্লেক করে তিনি বলেন,”শুরুতেই মহান আল্লাহ তা’আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। জীবনের অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে—হুইলচেয়ারে করে পরীক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে কম সিজিপিএ—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমি থামিনি। গবেষণার প্রতি আগ্রহই আমাকে এগিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পিএইচডিতে শুধু সিজিপিএ নয়, গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, শক্তিশালী পার্সোনাল স্টেটমেন্ট ও সুপারিশপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজ করে, তাহলে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সফল হওয়া সম্ভব।”

ভবিষ্যতে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় অবদান রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।

Leave a Response