সারা বাংলা

বিষে হারানো প্রাণের স্মরণে রাজশাহীতে ব্যতিক্রমধর্মী শোকমিছিল

55views

আফিয়া আনজুম, রাজশাহী

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি স্কুলপাড়া গ্রামে কীটনাশকের কারণে হারিয়ে যাওয়া প্রাণবৈচিত্র্যের স্মরণে ব্যতিক্রমধর্মী শোকমিছিল ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।

শুক্রবার (৫ জুন) শতবর্ষী আমগাছের ছায়াতলে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে কৃষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, কবি-সাহিত্যিক ও স্থানীয় জনগণ অংশ নেন।

উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (বারসিক), বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচির শিরোনাম ছিল ‘বিষে হারানো নীরব প্রাণের শোকমিছিল ও স্মরণসভা’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে অংশগ্রহণকারীরা শোকমিছিলে অংশ নিয়ে ‘প্রাণ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে’, ‘বিষ নয়, জীবন চাই’, ‘প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচাও, খাদ্য বাঁচাও’ এবং ‘মাটি বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে কীটনাশকের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণবৈচিত্র্যের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। একই সঙ্গে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।

নীরবতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় প্রকৃতিনির্ভর এক ব্যতিক্রমধর্মী ইকো-থিয়েটার। এতে ২৪ জন অংশগ্রহণকারী প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ও প্রাণবৈচিত্র্যের প্রতীকী চরিত্রে অভিনয় করে পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। নদী, মাটি, কৃষিজমি, কেঁচো, মৌপতঙ্গ, প্রজাপতি, ব্যাঙ, দেশীয় মাছ, জলাভূমি, গাছ, বৃষ্টির পানি, দেশীয় বীজ, মাটির অণুজীব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা একক অভিনয়ের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব সংকটের কথা তুলে ধরেন।

নদীর চরিত্রে অভিনয় করে তামিম তুলি বলেন, “আমি শুধু পানি নই; আমি ইতিহাস, সভ্যতা ও জীবনের ধারক। নদী যখন মরে যায়, তখন হারিয়ে যায় মাছ, কৃষি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা।”

মাটির চরিত্রে সোহেল রানা বলেন, “রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারে মাটির ভেতরের অগণিত অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। মাটি অসুস্থ হলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।”

প্রজাপতির চরিত্রে উম্মে ফাতেমা তুয জোহরা বলেন, “আমাদের হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি সুন্দর প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ারও সংকেত।”

একক নাট্যাভিনয়ের সমাপনী পর্বে ‘প্রকৃতির আইনজীবী’ চরিত্রে মো. আতিকুর রহমান বলেন, “প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করছি।”

পরে বারসিকের গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন। ঘোষণায় প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ, নদী ও জলাভূমি রক্ষা, রাসায়নিক নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে ইউসেপ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. শাহিনুল ইসলাম, বড়গাছি ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মাহমুদুল হক এবং রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুয়েল কিবরিয়া বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, কৃষিতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, ব্যাঙ, মাছ, কেঁচো ও মাটির অণুজীবসহ অসংখ্য উপকারী প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও এগ্রোইকোলজিভিত্তিক চর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শেষ পর্বে গ্রিন কোয়ালিশন পবা উপজেলা শাখার সভাপতি রহিমা খাতুনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণকারীরা ‘পৃথিবী রক্ষার সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক শপথ পাঠ করেন। এতে তারা নদ-নদী, মাটি, কৃষিজমি, বন, জলাভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা বিস্তারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

আয়োজকরা বলেন, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার সংগ্রাম কেবল প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করার লড়াই।

Leave a Response