জাতীয়

নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর জন্য ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ কে

197views

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। সংবিধান অনুযায়ী আগের সংসদের স্পিকারই নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়ানোর দায়িত্বে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই দায়িত্ব পালন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সংসদ সচিবালয় ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। অপরদিকে, তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন এবং তিনি এখনও পদত্যাগ করেননি।

সংবিধানের ৭৪ (৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত আগের সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে পদে বহাল আছেন বলে গণ্য করা হয়। সে ক্ষেত্রে সংসদ সচিবালয়ের ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ খোঁজার উদ্যোগ আইনগত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মতামতের জন্য নথি উপস্থাপন

এই প্রেক্ষাপটে গত ২৮ জানুয়ারি সংসদ সচিবালয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন—এ বিষয়ে মতামত চেয়ে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে নথি উত্থাপন করে। উপদেষ্টার সম্মতি পেলে বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুমোদনের পর নথি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যাবে এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির ভিত্তিতে আদেশ জারি করা হবে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বলেন, নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে শপথ কে পড়াবেন, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।

সংবিধানে শপথ বিষয়ে কী বলা আছে

সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদায়ী স্পিকার সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। ১৪৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকার তার মনোনীত কোনো ব্যক্তির কাছেও এমপিরা শপথ নিতে পারেন। আর ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে যদি স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তি শপথ না পড়ান, তবে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এই শপথ পাঠ করাবেন।

সংবিধানের এসব বিধান অনুযায়ী, পদত্যাগ করলেও শপথ পড়ানো বিদায়ী স্পিকারের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। তিনি ব্যর্থ হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব পালন করবেন।

গণভোট ও সংস্কার পরিষদের শপথ

এবারের সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে জয় এলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের আলাদাভাবে শপথ নিতে হবে।

সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, যিনি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন, তিনিই সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরও শপথ পড়াবেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের তফসিল-১ এ এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

স্পিকার পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি

সংবিধানের ৭৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। ৭৪ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার তার দায়িত্ব পালন করবেন। তবে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে থাকায় কার্যত দায়িত্ব পালন সম্ভব হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সংসদ সচিবালয় অধ্যাদেশ

দ্বাদশ সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান)’ অধ্যাদেশ জারি করে।

এই অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ কার্যক্রম ব্যতীত স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষমতা সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা প্রয়োগ করতে পারবেন। এর আওতায় একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।

উপদেষ্টা পরিষদের একটি সূত্র জানায়, সংসদ সচিবালয়ের উত্থাপিত নথির ভিত্তিতে সরকার এখন এমপিদের শপথ পড়ানোর জন্য ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নামও আলোচনায় রয়েছে।

Leave a Response