
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই, ১৯৭০ সালের মধ্যে মূল বাঁধ নির্মাণের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা এলাকায় নির্মিত এই বাঁধটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত। প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধ নির্মাণে সে সময় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয় এবং এতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। প্রথমে মাত্র ৪১ দিনের জন্য ভাগীরথী নদীর ফিডার ক্যানেলে পানি প্রবাহের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে সেই ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এরপর থেকেই বাংলাদেশের গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করে, যা দেশের কৃষি, নদী, নৌপথ ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। তবে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সীমিত পরিমাণ পানি পেলেও পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ফারাক্কা চুক্তির পরও মেলেনি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা। গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একাধিক চুক্তি হলেও এখনো পানির ন্যায্য হিস্যা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই শুষ্ক মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পানি না পাওয়ায় দেশের নদী, কৃষি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও দক্ষিণ এশিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৯৭৭ সালে ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বণ্টনে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল।
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, এপ্রিলের শেষ ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্টে প্রায় ৫৫ হাজার কিউসেক পানির মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক এবং ভারত পাবে ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। এছাড়া পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ তার নির্ধারিত অংশের অন্তত ৮০ শতাংশ পানি পাবে এমন গ্যারান্টিও রাখা হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছিল। তবে ১৯৮২ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশ নবায়নের আগ্রহ দেখালেও ভারতের আপত্তিতে তা আর সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে একই বছরের ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সেখানে আগের কিছু শর্ত বহাল থাকলেও বাংলাদেশের জন্য ৮০ শতাংশ পানি পাওয়ার গ্যারান্টি বাতিল করা হয়। ফলে পানিবণ্টনে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। এদিকে ১৯৭৯ সালে নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নদী কমিশন গঠনের যে পরিকল্পনা ছিল, সেটিও পরবর্তী সমঝোতায় বাদ পড়ে যায়। এতে আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সমাধানের পথ সংকুচিত হয় বলে মনে করা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের বহু নদী শুকিয়ে গেছে, সেচ সংকট বেড়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে গেছে। তারা আরও জানান, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নদীপথ অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আলোচনা সভা, সমাবেশ ও স্মরণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ঢাকাসহ রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি পালিত হবে।






