রাজনীতি

রাজনীতিতে তারেক রহমান, নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে

118views

প্রায় দুই দশকের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জনমত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী এই নেতার জীবনে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হবে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

২০০৯ থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের আগস্টে। তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে তার সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এর প্রায় দেড় বছর পর, ২০২৫ সালের বড়দিনে বিএনপি নেতা তারেক রহমান দেশে ফেরেন। ঢাকায় তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায় এবং তাকে দেওয়া হয় বীরোচিত সংবর্ধনা।

২০০৮ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তারেক রহমান। এরপর প্রায় ১৭ বছর তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। এই সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয় এবং ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০১৮ সালে তার অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে শেখ হাসিনার পতনের পর এসব মামলায় তিনি খালাস পান। তারেক রহমান বরাবরই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

তারেক রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমান নিজেকে আগের দাপুটে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি থেকে সরিয়ে এক সংযত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকার আমলে বিএনপির ভেতরে ‘সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র’ পরিচালনার অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেন। বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক প্রতিশোধের পথ পরিহার করে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, প্রতিশোধ মানুষকে কিছু দেয় না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা। তিনি আরও বলেন, দেশে ফেরার পর ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত ঘটছে যে, নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবার সময় পাচ্ছেন না।

নীতিগতভাবে তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে কিন্তু দেশ কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। এটি ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীদের জন্য সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

দলে তারেক রহমানের নেতৃত্ব এখন সুদৃঢ়। দলীয় সূত্র জানায়, প্রার্থী নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ ও জোট আলোচনা সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। একসময় তিনি এসব কাজ প্রবাসে বসে করলেও বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ভাবমূর্তি নরম করার চেষ্টা স্পষ্ট। পরিবারের পোষা সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’-এর উপস্থিতি তার মানবিক দিক তুলে ধরতে সহায়তা করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তার ভাষায়, গণতন্ত্র চর্চা করলেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হয় এবং দেশ পুনর্গঠন সম্ভব।

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, দীর্ঘ নির্বাসনের পর তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Response