
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন- এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। দুদকের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করায় নতুন কমিশন গঠনে তোরজোড় শুরু হয়েছে।
এর মধ্যে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শুনা যাচ্ছে জোরেশোরে। একই সঙ্গে দুই কমিশনারের বিষয়ে অনেকের নাম জানা যাচ্ছে। নতুন ওই তিন মুখ খুঁজে বের করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে থেকে শিগগির পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই খবর জানা গেছে।
সার্চ কমিটি একাধিক সভা করে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে শীর্ষ তিনটি পদের জন্য ছয় জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কমিশনার হিসেবে তিনজনকে নির্বাচিত করবেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেবেন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে দুদকের মামলা থেকে গত ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন সাবেক ওই স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন। অর্থ পাচারের অভিযোগে তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ওয়ান ইলিভেনের পর।
নতুন কমিশনার পদের জন্য যাদের নাম শুনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, পুলিশের সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলাম। এবার অষ্টম কমিশন গঠন করা হবে।
দুদকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করায় রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নেতৃত্ব শূন্য। স্থবির হয়ে আছে কাজকর্ম। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম চালু রাখতে দ্রুততম সময়ে কমিশন গঠন করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন দুদকের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কমিশন শূন্য দুদকে মামলা, চার্জশিট, সন্দেহভাজন আসামিদের বিদেশ যাত্রা রহিতরকণ সংক্রান্ত আদেশের অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দুদক আইন ও বিধিতে কমিশনের অবর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনার কোন ধরনের আইনি সুযোগও রাখা হয়নি। তবে অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান-তদন্ত কাযর্ক্রম, আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।
পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে যারা থাকবেন তারা হলেন- সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব ও সরকারি কর্ম-কমিশনের চেয়ারম্যান।
সার্চ কমিটি যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রথমে দুদকে তিনজন কমিশনার নিয়োগের জন্য ছয়জন ব্যক্তির নামের তালিকা তৈরি করে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবেন। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা থেকে তিনজনের নাম কমিশনার হিসেবে চূড়ান্ত করবেন। পরে এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেবেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সমকালকে বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে দুর্নীতিবিরোধী সোচ্চার, আপসহীন ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে কাউকে কোনভাবে যাতে নিয়োগ দেওয়া না হয়। বিগতদিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় কমিশন দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি। মুখ দেখে, পরিচয় দেখে কাজ করা হয়েছে। এই কারণে দুদক বরাবরই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি।
জানা গেছে, এর আগে ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাতটি কমিশন দুদকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে চারটি কমিশনকেই চার বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিদায় নিতে হয়েছে। এ কারণে ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুর্নীতিবিরোধী সার্বিক কার্যক্রমে এক ধরনের অস্থিরতা ছিলো।
সাবেক বিচারপতি প্রয়াত সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব পালন করেছেন ২ বছর তিন মাস। লে: জে: (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশন দুই বছর দায়িত্বে ছিলেন। সরকারের সাবেক সচিব গোলাম রহমান, সরকারের সাবেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান ও সরকারেরসাবেক সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন যাথারীতি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ করেছেন। সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ তিন বছর ছয় মাস ও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এক বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করেছে।






