ক্যাম্পাস

অনুমতি জটিলতায় প্রীতি ম্যাচ স্থগিত, ক্ষোভ আবাসিক শিক্ষার্থীদের

48views

জুহায়ের আখতার সম্প্রীতি, বুটেক্স প্রতিনিধি

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)-এর মধ্যকার একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা এবং হল প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ম্যাচটি স্থগিত করা হলে, এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বুটেক্স ও বিইউএফটির মধ্যে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিইউএফটির শিক্ষার্থীরা জি.এম.এ.জি ওসমানী হলের গেটের সামনে উপস্থিত হন। তবে নিরাপত্তাকর্মী তাদের প্রবেশে বাধা দিলে আয়োজক খেলোয়াড়দের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তারা হলে প্রবেশ করেন। এ সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিপক্ষ দল ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছে যাওয়ায় তাদের ফিরিয়ে দেওয়া সমীচীন মনে হয়নি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়। এরপর খেলা শুরু হয়।

পরে বিষয়টি জানতে পেরে জি.এম.এ.জি ওসমানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান টিমসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অনুমতি উপেক্ষা করে খেলা আয়োজনের অভিযোগে ম্যাচটি স্থগিত করেন। এ সময় তিনি বিইউএফটির শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে কয়েকজনকে অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

অনুমতি প্রসঙ্গে জানা যায়, আগের দিন রাতে আয়োজক খেলোয়াড় ফারহান ফোনকলের মাধ্যমে প্রভোস্টকে বিষয়টি অবহিত করেন। তবে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যে না পড়ার কারণে প্রভোস্ট তা নাকচ করে দেন। ম্যাচের দিন সকালেও পুনরায় অনুমতির জন্য জানানো হলেও সেটি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ভুক্তভোগী ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইকরামুল হাসান বলেন, গতকাল বিইউএফটির শিক্ষার্থীরা যখন আসে, তখন তাদের হলে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। পরে আমরা কয়েকজন অনুরোধ করি, যেহেতু তারা ইতোমধ্যে চলে এসেছে, তাই যেন তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। পরে নিরাপত্তাকর্মী প্রভোস্ট স্যারকে জানান যে আমি এবং ৫০তম ব্যাচের আরেকজন তাকে চাপ দিয়েছি। তবে বিইউএফটির খেলোয়াড়রা প্রবেশ করার পরও অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে খেলা শুরু হচ্ছিল না। তখন আমার ব্যাচমেটরা আমাকে প্রভোস্ট স্যারের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুরোধ করে। আমি ফোন দিলে প্রথম দুইবার স্যার ফোন রিসিভ করেননি। এবং পরে স্যার খেলা চলাকালীন মাঠে এসে খেলা বন্ধ করে দেন এবং বিইউএফটির খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে বের করে দেন।

এরপর স্যার আমাদের চারজনকে একে একে তার রুমে ডাকেন। আমি স্যারকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমি আয়োজক নই, শুধু প্রতিনিধি হিসেবে ফোন করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্যার আমাকে কথা শোনিয়ে বের করে দেন। এরপরে আবার আমাকে এবং ৫০তম ব্যাচের আরেকজনকে অফিসে ডাকা হয়। সেখানে অফিস কর্মকর্তা জানান, স্যার আপনাদের ৬ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার অথবা ৫ হাজার টাকা জরিমানা করতে বলেছেন। সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে মঙ্গলবারের মধ্যে অভিভাবক নিয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

তবে এ ব্যাপারে খোজ নিয়ে জানা যায়, শাস্তির ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু কি কি শাস্তি হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।

আয়োজকদের একজন সিরাজুম মনির জাদিদ বলেন, অতিথি হিসেবে আসা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির এমন আচরণ কি গ্রহণযোগ্য? এর আগেও বুটেক্স টিম অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অনেক ম্যাচ খেলেছে, কখনোই সামান্য আবেদন করা নিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই একই পরিচয়ের—শিক্ষার্থী। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা কি আমাদের দায়িত্ব নয়? একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় শুধু তার নিয়মে নয়, বরং তার আচরণেও প্রতিফলিত হয়।

জি.এম.এ.জি ওসমানী হলের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি সৌমিক সাহা বলেন, খেলার আগের দিন আমাকে অনুমতির বিষয়ে জানানো হয়। তখন আমি জানতে চাই এটি কারা আয়োজন করছে। তারা জানায়, এটি স্পোর্টস ক্লাবের উদ্যোগ। তবে বিষয়টি যেহেতু হল-সংক্রান্ত ছিল না এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি, তাই আমি অনুমতি নিয়ে দিতে অপারগতা প্রকাশ করি এবং আয়োজকদের প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করতে বলি।

এ নিয়ে জানতে চাইলে বুটেক্স স্পোর্টস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ মিস্ত্রী তীর্থ জানান, স্পোর্টস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংশ্লিষ্ট স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে কেউ অনুমতি নেয়নি; বরং সাধারণ শিক্ষার্থীরাই বিষয়টি স্যারকে জানিয়েছিল। ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্ট, টিম নির্বাচন কিংবা আমন্ত্রণ—কোনো ক্ষেত্রেই স্পোর্টস ক্লাবকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

এ বিষয়ে জি.এম.এ.জি ওসমানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, গতকালকে বাইরের কোন টিমের সাথে ওসমানী হলের মাঠে খেলার বিষয়ে ৪৭ ব্যাচের একজন ছাত্র আগের দিন রাতে আমাকে ফোনে জানায়, যা কোনোভাবেই নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে না। এভাবে হঠাৎ করে অনুমতি চাওয়া এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করার শামিল। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট বা ম্যাচ আয়োজন অবশ্যই স্বাভাবিক বিষয়, তবে এর জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন। ঘটনার দিনে হল প্রশাসনের অনুমতি ব্যাতিরেকেই তারা হলের গেটম্যানের বাধা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক ১৫-২০ বহিরাগতকে হলে প্রবেশ করায় এবং ক্রিকেট ম্যাচ চালিয়ে যায়। অনুমতি ছাড়া এভাবে বহিরাগতদের হলে প্রবেশ করানো এবং হলের খেলার মাঠ ব্যাবহার করা হলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী।

তিনি আরো জানান যে, ইতিপূর্বে ওসমানী হলের মাঠ বেশিরভাগ সময় বহিরাগতদের দখলে থাকতো- এ বিষয়ে হলের আবাসিক ছাত্রদের সবসময় আপত্তি ছিলো। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল বহিরাগতদের জন্য উক্ত মাঠ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে জি.এম.এ.জি ওসমানী হল ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আজ দুপুর ১টায় ওসমানী হল গেটের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সে নিয়ম ভেঙে অনুমতি ছাড়া খেলা হলে ভবিষ্যতে সুযোগের অপব্যবহার, বিশৃঙ্খলা এবং বহিরাগত অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, অনুমতি না পাওয়ার পরও জোরাজুরির ঘটনায় শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই বলে অনেকে মনে করছেন।

Leave a Response