
বয়স মাত্র নয় দিন। এর দুই নবজাতক শিশুর শরীরে প্রায় সব ধরনের এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই জন্মের পর থেকেই হাসপাতালের বিছানায় কাটছে সময়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় সময় কাটছে মা-বাবার।
এখনও নাম রাখা হয়নি এই যমজ দুই নবজাতকের। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিউনেটাল আইসিইউতে তাদের ডাকা হচ্ছে ‘মানিক-১’ ও ‘মানিক-২’ নামে।
শিশু দুটির বাবা নাটোরের লালপুর উপজেলার লক্ষণবাড়িয়া গ্রামের মানিক উদ্দিন পেশায় চিকিৎসক। গত ৫ মে রামেক হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে তার স্ত্রী কোহিনুর সুলতানা যমজ দুই সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর প্রথমে স্বস্তিতেই ছিল পরিবার। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা জানান, নবজাতক দুটির শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক নয়। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হবে।
প্রথমে শিশু দুটিকে হাসপাতালের ২৬ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে স্থানান্তর করা হয় ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের নিউনেটাল আইসিইউতে। তখন থেকেই অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাদের।
শিশুদের বাবা মানিক উদ্দিন বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম কয়েকদিনের মধ্যেই বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। কিন্তু এখন চিকিৎসকেরা বলছেন, শরীরে প্রায় সব এন্টিবায়োটিকই কাজ করছে না। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
গত সোমবার (১১ মে) নবজাতক দুটির ‘কালচার অ্যান্ড সেনজিটিভিটি টেস্ট’সহ কয়েকটি পরীক্ষা করানো হয়। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রিপোর্ট হাতে পান চিকিৎসকেরা। রিপোর্টে দেখা যায়, শিশু দুটির শরীরে অধিকাংশ এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে।
ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক মোহতারামা মোস্তারী বলেন, মানিক-১’-এর অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও ‘মানিক-২’ বেশি সংকটাপন্ন। তার শরীরে অক্সিজেনের চাহিদাও বেশি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ ওষুধে কাজ হয় না। তাই বাধ্য হয়ে ‘কলিস্টিন’ নামের শক্তিশালী একটি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। রিপোর্ট পাওয়ার আগেই আমরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ওষুধটি শুরু করি। পরে রিপোর্টেও একই বিষয় নিশ্চিত হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এন্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারই এমন পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন বলেন, “প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার, সঠিক ডোজ অনুসরণ না করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনের কারণে ধীরে ধীরে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতিরোধক্ষম হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ এন্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় যে রোগ স্বল্পমাত্রার ওষুধেই সেরে যাওয়ার কথা, সেখানে দ্রুত ফল পেতে উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে রোগীর শরীরে সেই ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি জানান, বর্তমানে রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ল্যাবেই ‘কালচার অ্যান্ড সেনজিটিভিটি টেস্ট’ করা হচ্ছে। পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর শরীরে কোন ওষুধ কার্যকর এবং কোনটি অকার্যকর—তা নির্ধারণ করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।





